ব্যাভিচার
[পেরুর
গল্প]
এনরিক
লোপেজ আলবুজার
[অনুবাদ – দেব
চৌধুরী]
টাকনা শহর থেকে ফিরে কার্মেলো তাঁর বৌয়ের চলাফেরায় কিছু পরিবর্তন
লক্ষ্য করল। শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার আগে পর্যন্ত সে তার বৌকে পরিশ্রমী হিসেবে
দেখতেই অভ্যস্ত ছিল, কিন্তু ইদানিং মনে হচ্ছে সে খুব কুড়ে। সুতো কাটার চরকা তার
হাতে আর আগের মত ঘুরছে না। আর যে মাংসের ঝোল সে কার্মেলোর জন্য রানা করছে তাও আর
আগের মত সুস্বাদু হচ্ছে না। সে থেকে থেকে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছে আর মুহুর্তে অন্যমনস্ক
হয়ে নিজের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে, কার্মেলো কি বলছে না বলছে সে সব তার কানেই যাচ্ছে
না।
কিন্তু ইসিডোরার হলোটা কি? যদিও এটাই তার একমাত্র মাথাব্যাথার কারণ
নয়। স্বামী-স্ত্রীর সহশয্যার স্বাভাবিক নিয়মকে ইসিডোরা অস্বীকার করছে আর এরকম সে
করে চলেছে কার্মেলো বাড়ি ফেরার পর থেকেই। এমন কি দরজা ভেঙে ফেলার হুমকিতেও সে দরজা
খুলছে না। কাজেই সমস্যাটা বেশ জটিল হয়ে উঠছে। তাদের তিন বছরের জীবনে কখনোই তাদের
শয্যা আলাদা হয় নি, না, একদিনের জন্যও না। এমন কি কোন ঝগড়া বা অসুস্থতার কারনেও
না। পুরোহিতের মন্ত্রের জোর ছিল বলতে হবে, তাই তারা কখনও আলাদা হয় নি বরং একসাথে
মিলেমিশে থেকেছে, বিশেষত রাতে, কারণ বিয়ের সেটাও একটা উদ্দেশ্য।
তবে কি ইসিডোরা তার সাথে ঘুমোবে না? তাছাড়া সমস্যাটা নিয়ে আলোচনাও প্রয়োজন ছিল। হয়ত
তার উচিৎ ছিল টারাটায় গিয়ে যে পুরোহিত তাদের বিয়ে দিয়েছিল তার কাছে সব কথা খুলে
বলা। অথবা ধর্মগুরু কালাটার কাছে গেলেও হত।
এমনও হতে পারে যে অলক্ষুণে বাজ পাখীটা তার চালের উপর পাক খেয়েছিল।
কিংবা উপযুক্ত দক্ষিণার বিনিময়ে গীর্জা থেকে যে উপাচার সে পেয়েছিল, কোনো শেয়াল
তাতে গন্ধ শুঁকেছিল, অথবা বলা যায় না, শেয়ালটা তাতে মুখ দিয়ে এঁটো করেই দিয়েছিল।
এই সব বিভিন্ন সম্ভাবনা তার মাথার মধ্যে পাক খাচ্ছিল আর সে কিছুতেই
ঠিকমত ভেড়াগুলোর দিকে নজর দিতে পারছিল না। একদিন সে হঠাৎ রেগে উঠল আর ভেড়াগুলোকে
ঘরে তোলার জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত
অপেক্ষা না করেই বাড়ি ফিরে এল, আর ফিরে এসে দেখল, তার বৌ ফোঁপাচ্ছে আর আস্তিনে চোখ মুছছে।
- তুমি কি কাঁদছিলে?... কি এমন
খারাপ ঘটনা দেখেছ যে তোমার চোখে জল? কেউ কি মারা গেছে, যে তোমার কাছে আমার থেকেও
আপন?
- কিছু না। আসলে উনুনে ধোঁয়া
উঠছে, সেজন্যই।
- ঠিক এই কারণে আগে কখনও তোমার চোখে জল দেখিনি। বোধহয় তুমি শহুরে
মেয়েদের মত আদুরে হয়ে যাচ্ছো। তোমার কি কোন কষ্ট হচ্ছে?
- হয়ত।
- আমি কি সেটা সারিয়ে দিতে পারিনা?
- কিছুতেই না। এটা তো আর ছুরির কাঁটা দাগ না, বা কো পাথর বা কারো
হাতের আঘাতও না।
- তাহলে সেটা কি?
- তা বলার সাহস যদি আমার থাকত, কার্মেলো...
- কেন, শেয়ালগুলো এখানেও ঘোরাঘুরি করছে?
- তার চেয়ে খারাপ। সে রাস্তায় আমাকে ধরেছিল।
- তুমি কী করলে?
- কী করব? আমি তো একা ছিলাম। তোমাকে ঠকাতে চাইনি, কার্মেলো, কিন্তু
আমি বাধা দিতেও পারিনি।
ভারতীয়টির গলায় যেন পাথর
চেপে বসল। কাঁধের বোঝাটা মাটিতে ছুড়ে
ফেলল, প্রচন্ড রাগে তার মুখের চেহারা বদলে গেছে, সে বৌয়ের দিকে এগিয়ে তাকে চেপে
ধরল, “তুমিও... ব্যাভিচার? কার সাথে?
- আমি তোমাকে সমস্ত কথা বলব।
স্বামীর ভয়াল চাহনি বৌয়ের মনে ভয়ের বদলে সাহসের সঞ্চার করল। যে ঘটনা
তাদের জীবনকে অন্ধকার করেছে সেই গোটা কাহিনী সে বলার জন্য গোছাতে শুরু করল।
ঘটনাটা ঘটেছিল তাদের নির্জন খামারের দিকে, কাপুজোতে, কার্মেলো ফিরে
আসার আগের রবিবার বিকেলে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল আর ইসিডোরা সেচের নালায় জল দিচ্ছিল।
হঠাৎ অস্বস্তিকর কিছু একটা অনুভব করে সে পিছনে তাকাল। সেখানে ঝোপের আড়ালে দুটো চোখ তাকে লক্ষ্য করছিল। লেওন্সিও কেলোপানা। তাদের প্রতিবেশী। ইসিডোরা ভয় পেয়ে হাতের গামলা ফেলে দিয়ে দৌড়তে গেল। কিন্তু সে এত লজ্জা
পেয়েছিল, ইঁদুর যেমন মানুষ দেখে ভয়ে কুঁকড়ে যায় সেই রকম অভিনয় সে দেখাতে পারল
না।
বরং আলতো হেসে ভিতরের উত্তেজনাকে ঢাকার চেষ্টা করল আর লেওন্সিও
ততক্ষণে ঝোপ থেকে বেরিয়ে আলের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। এবং একটাও কথা না বলে সে
ইসিডোরার উপর চিতাবাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপর কিছুটা ধস্তাধস্তি, দু’একটা কামড়
পড়ল লেওন্সিওর গায়ে, এবং ইসিডোরার চিৎকার, যদিও তা কেউ শুনল না কারণ কাছাকাছি কেউ
ছিল না। একমাত্র দর্শক সূর্য তখন অস্ত যাওয়ার
তাড়ায় ওসব দেখার সময়ও পেল না। যা ঘটার তা ঘটল। কিন্তু তা ছিল ইসিডোরার সম্পূর্ণ
ইচ্ছার বিরুদ্ধে। এই ঘটনার জন্য সে এখনো বিধ্বস্ত বোধ করছে আর মনে মনে অভিশাপ
দিচ্ছে লেওন্সিওকে।
ইসিডোরা তার কাহিনী শেষ করল এই বলে, “যখন সে আমায় ছেড়ে
দিল, আমি ভাবলাম দৌড়ে গিয়ে ধর্মগুরু কালাটার কাছে সব কথা বলি। কিন্তু ভয় হল যে
লেওন্সিও আবার আমাকে ধরে একই কাজ করতে পারে। তাই আর যাই নি। বরং ঘরে গিয়ে দরজায়
খিল তুলে দিলাম, আমার ভয় হচ্ছিল লোকটা
রাত্রে আবার চলে আসতে পারে। আমি চুপচাপ বসে ঈশ্বরকে ডাকলাম যাতে তুমি তাড়াতাড়ি চলে
আসো। তিনি আমার কথা শুনেছিলেন, ঠিক সেই সপ্তাহেই তুমি ফিরে এলে।
তার কাহিনী এর চেয়ে নিখুঁত হতে পারত না। এমন কি ঘটনাটিও এর চেয়ে বেশী কর্কশ বা যন্ত্রনাদায়ক নয়। কিন্তু ভারতীয়টি কিছুতেই সন্তুষ্ট হতে পারল না। ঘটনার পিছনে ইসিডোরার কি একটুও
প্রশ্রয় ছিল না? সে তো একেবারে দুর্বল বা নিরস্ত্রও ছিল না। তবু কেন সে নিজেকে
বাঁচাতে পারল না? ভারতীয়টি স্বামী হয়ে কিছুতেই সেই নারীলোলুপ ভারতীয়টিকে মেনে নিতে
চাইল না। যতবার চেষ্টা করল, সে নিজের লজ্জায় কুঁচকে গেল।
একজন পুরুষ এবং একজন স্বামী হিসেবে তার যে মর্যাদা তাতে আঘাত লেগেছে।
তার চোখদুটো দপ করে জ্বলে উঠল। মাটির দেয়ালে ঝোলানো ছোরাটা তার নজরে এল, সে নিজেকে
সংযত করার চেষ্টা করল, ‘তাহলে আমার আত্মীয়ই (শ্যালিকার স্বামী) আমার মর্যাদাকে
ধ্বংস করল; ঐ ছোরা দিয়ে আমি ওকে খুন করব।”
- না, কার্মেলো। অমন কাজ কোরো না। তুমি ওকে খুন করলে আমি এখানে একা
হয়ে যাব। তাতে ব্যাভিচার কমবে না বরং বেড়েই যাবে। এই জন্যেই আমি তোমাকে কিছু বলতে
চাইনি।
- কিন্তু আমি যদি তা না করি, লেওন্সিও ভাববে আমি ভয় পাচ্ছি। সে আর
আমাকে সম্মান করবে আর তোমাকেও একা থাকতে দেবে না, আর আমিও ফসল বা উল বিক্রি করতে
খুব দূরে যেতে পারব না।
- ও সব ভেবো না, কার্মেলো। ও যদি আবার আসে, আমি ছুরি চালাবো। তোমার
ছোরাটা দেখছ না, ওখানে ঝোলানো
রয়েছে? একা বেরুনোর সময় ওটা
আমার সঙ্গে থাকবে।
ভারতীয়টি এতে শান্ত হল। তবু ভেতর থেকে তার মনে হল, ইসিডোরা যদিও তাকে সবই বলেছে, তবু তার নিজের কিছু করা দরকার। হয় সব মেনে নেওয়া, নয়
আঘাত করা। যদি সে কিছুই না করে, তাহলে চিরকাল অবহেলা মেনে চলতে হবে। কারণ, ঘটনাটা
সম্ভবত কাইরানি গ্রামের সবাই জেনে ফেলবে।
কিভাবে সে সবকিছু মেনে নিয়ে চুপচাপ বসে থাকবে? শাদা চামড়াদের সাথে হলে
জোচ্চুরি চলতে পারত। সেটা একটা কর্তব্যও বটে, কেননা তাদের সাথে লড়াইয়ে কূটনীতিই
তাদের একমাত্র অস্ত্র। এটাই সম্প্রদায়ের নিয়ম। কিন্তু ব্যাপারটা যখন আরেকজন
ভারতীয়ের সাথে, যে একই সম্প্রদায়ের আরেকজন, সেখানে ভাড়ামি চালালে সেটা হবে
কাপুরুষতা, এ এক নৈতিক ছোঁয়াচে রোগ যা
কিছুতেই স্বস্তিতে বাঁচতে দেয় না। আর তাই, ভারতীয়দের মধ্যে, পুরোপুরি শাস্তির
ব্যবস্থা নিতেই হবে। হ্যাঁ, শাদা চামড়াদের বোকা বানাও, ঠকাও, তাদের মিথ্যা বলো,
যতখুশি ভন্ডামি চালাও, তা’বলে একজন ভারতীয়ের সাথে কখনোই তা চলবে না। ঋণশোধ অথবা
প্রতিশোধ যাইহোক, তা নিতে হবে সঙ্গে সঙ্গে, সবার সাথে সমান ভাবে, যেমন মানুষের
সাথে মানুষের সম্পর্ক, কোনরকম পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই।
তবে কেন সে লেওন্সিও’র কাছে যাবে না? যে মানুষ কারো ক্ষতি করেছে,
ক্ষতিপূরণ দিতেও সে প্রস্তুত থাকবে নিশ্চয়ই। এই নীতিকথা কার্মেলো ছেলেবেলা থেকে
বারবার শুনে আসছে। তাছাড়া এটা ভারতীয় আইলো সম্প্রদায়ের নৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক
ব্যবস্থার একটা আইনও বটে। ধূর্ত আইন ব্যবসায়ী আর ঘুষখোর কেরানীরা মামলার কাগজপত্র
তৈরি করতে গিয়ে এই নীতিকে আরো বেশী জোরদার করেছে।
কেলোপানা কি তার মর্যাদা নষ্ট করে নি? বেশ, তাহলে এর জন্য তাকে মূল্য
দেওয়া উচিৎ। চিন্তাটা তার মনে হল প্রতিশোধের একটা ভাল কারণ হতে পারে। যেখানে
ক্ষতিপূরণটা তার নিজের গাট থেকে যেতে পারে, সেখানে অন্যকে আঘাত করা কি উচিৎ কাজ হয়েছে? কেননা এই ধরনের ক্ষতিপূরণে যন্ত্রণা খুব বেশী।
ফলে ভবিষ্যতে সে আর জেলে যাওয়া বা ফেরারি হওয়ার ঝুঁকি নেবে না।
কার্মেলো নিজের এই লোলুপ চিন্তায় উত্তেজিত হয়ে উঠল। সে যেন পরিষ্কার
দেখতে পেল বিচারকের সামনে সে আপীল করছে, আর বিরোধীরা তার বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখছে,
রায় ঘোষণার আগে অপরাধ স্বীকার এবং ইসিডোরার অশ্রুপাত। তারপর দলিল দস্তাবেজ আনা হবে
যাতে ঘটনার বিবরণী আছে। বিচারক এবং সাক্ষীদের তা যাচাই করা, এবং সবশেষে
ক্ষতিপূরণের শাস্তি ঘোষণা। শাস্তি। মানে মোটা মাপের অর্থদন্ড, এত বেশী মোটা যে
লেওন্সিও’র পক্ষে দেওয়া বেশ কষ্টকর। তারপর তার সম্পত্তির কথাও উঠতে পারে, বিচারক
তার ক্ষেতজমি, ভেড়া আর অন্যান্য পশু আর আলফালফার বাগান, অর্থাৎ তার সমস্ত কিছুই
বাজেয়াপ্ত করতে পারে। কারণ কেলোপানা স্বেচ্ছায় যা দেবে তাই নিয়েই কার্মেলো
সন্তুষ্ট হবে না। এই মামলা যদি সত্যিই হয়, কার্মেলোর অনেক বন্ধু আছে কাইরানি
গ্রামে বা টারাটাতে যারা তাকে সমর্থন ক’রে তার হয়ে লড়বে। আর যদি মামলাটাকে টাকনায়
নিয়ে যাওয়া যায় তবে তো আরো ভাল। মামলা চালাতে ঈশ্বর তাকে সাহায্য করবে।
এই সমস্ত কথা চিন্তা করে আর একই সাথে প্রাচীন সংস্কারের বশবর্তী হয়ে
সে আদালতে যাওয়াই স্থির করল। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে যে বিচার চায় তাকেই শুনানির
আয়োজন করতে হয়। তাই সে স্থির করল বিচারসভায় কেলোপানাকে ডাকবে।
সামাজিক রীতি অনুযায়ী সে প্রথমে গেল ধর্মগুরু কালাটার কাছে। কালাটা
হবে বিচারসভায় সভাপতি। বিচারসভায়, কিছুটা ব্র্যান্ডি পান করে, মাকুয়েরা শান্ত গম্ভীরভাবে (যেহেতুর আনুষ্ঠানিকতার ত্রুটি
থাকবে না) ঘটনার নিখুঁত বিবরণ দিল যদিও কিছুটা রঙ মাখানোও হয়েছিল। সে দিব্যি দিয়ে বলেছিল যে ইসিডোরা যখন তাকে ঘটনাটা বলছিল, তখন তার ছোরাটা
উত্তেজিত হয়ে খাপ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছিল, কিন্তু সে তা অনুমোদন করে নি। আসলে
ধর্মগুরুর নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত ছোরাটা খাপের মধ্যে থাকুক – এটাই তার ইচ্ছা
ছিল।
কালাটা একটু মাথা চুলকে আরেক পাত্র
মদের জন্য ইঙ্গিত করলেন। এবং গলায় কিছুটা ঢেলে নিয়ে দার্শনিক ভঙ্গীতে ছাদের
দিকে তাকালেন। তারপর মুখ থেকে কিছুটা মদ থুতু করে ফেললেন। “বেশ আমি শুনলাম সব।
কারণ আমাদের নিয়ম অনুযায়ী একজন ঈশ্বরের সন্তান সবটাই শোনেন, যখন কেউ তার কাছে
দুখের কথা বলে আর উপদেশ চায়। তুমি তোমার ছুরিকার কথায় কর্ণপাত না করে ঠিকই করেছ।
লেওন্সিও তোমার যা ক্ষতি করেছে তা এখনও অসম্পূর্ণ।”
মাকুয়েরা এই কথায় একটু ধাক্কা
খেয়ে বোতলটা টেবিলের উপর ঠকাস করে রাখল। আর হতভম্ব হয়ে বলল, “কি রকম হল? অসম্পূর্ণ
কেন?”
“আমি বলছি, অপরাধটা ছিল অসম্পূর্ন কারণ কেলোপানা যা করেছে তা
সে একাই করেছে, ইসিডোরার তাতে বিন্দুমাত্র সমর্থন ছিল না। সে এই ব্যাভিচারে
সাহায্য করে নি। যদি সে এতে বাধা না দিয়ে থাকে তবে তার কারণ সে বাধা দিতে পারে নি।
শেয়াল যখন মুরগির গলা কামড়ে ধরে আর মালকিন যখন ঘুমিয়ে বা অন্যদিকে ব্যাস্ত থাকে
তখন কি সে বাধা দিতে পারে? শাদা চামড়াদের একটা প্রবাদ আছে – সুযোগই তৈরি করে চোর;
আমার ধারণা ওরা ঠিকই বলে। ভুলে যেও না কার্মেলো, টাকা-পয়সা আর বৌকে সবসময় ট্যাঁকে
গুঁজে রাখতে হয় যাতে অলৌকিক শক্তি ছাড়া কোন চোর ওগুলো নিতে না পারে। তুমি যখন
টাকনায় গিয়েছিলে ইসিডোরাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারো নি?”
“তাহলে আমার ক্ষেত
খামার, আলফালফার বাগান, ভেড়া – এসব দেখার জন্যে কাকে রেখে যাব?”
“হ্যাঁ, খামার আর
ভেড়াগুলোর দাম যথেষ্টই বটে, এমন কি কখনও কখনও একজন বৌয়ের চেয়েও বেশী; কিন্তু তোমার
বৌটি আরো বেশী দামী। তাকে একা রেখে যাওয়া তোমার উচিৎ হয় নি। বুঝলে কার্মেলো, আমি
ভাবছি এবার থেকে তুমি যখনই টাকনায় যাবে, ইসিডোরাকে সঙ্গে নিয়ে যাবে। আমি শুনেছি
সেখানে নাকি সবধরনের শেয়ালের জন্য বিভিন্ন দামে সুন্দর মুরগীছানা পাওয়া যায়,
সত্যিই পাওয়া যায়?”
মাকুয়েরা গম্ভীর
পরিবেশের মধ্যেও মুচকি ও ধূর্ত হাসি হেসে বলল, “আপনি অনেক জানেন, হে ধর্মগুরু
কালাটা। লেওন্সিওর ব্যাপারে কী করা যায় বলুন। কারণ, আপনি বা ইসিডোরা, কেউই
রক্তপাতের মাধ্যমে মীমাংসা চায় না।”
“তোমার মর্যাদা
হানির জন্য সে যদি ক্ষতিপূরণ দিতে চায় তবেই যথেষ্ট হবে। এছাড়া আর কি আশা করা যায়?
দুশো সোল হলে চলবে কি?”
“মাত্র দুশো!
ইসিডোরা কিন্তু বৃদ্ধা নয়, যুবতী। তাছাড়া লেওন্সিওর গোয়ালটাও বেশ বড়। সে কেন পাঁচশ
দেবে না?”
“মাকুয়েরা, তোমার
কি মাথা খারাপ হয়েছে? কেলোপানা অত টাকা পাবে কোথায়? যাই হোক, তোমরা এখন যাও আর আজ
রাতের সভায় যারা থাকবে তাদের সাথে দেখা করো আর বাকিটা আমার উপর ছেড়ে দাও। কেলোপানা
পরিবারের ব্যাপারটা আমি দেখছি।”
সভাতে যাদের আসার
কথা ছিল সবাই মোটামুটি হাজির হয়েছিল এবং সভা বসেছিল শেষ রাতের দিকে, একেবারে ভোর
চারটায়। আইলো সম্প্রদায়ের এটাই নিয়ম। ভোর হওয়ার আগেই এ ধরনের সভা সেরে ফেলা হত
যাতে সভার বাইরের অন্যান্যরা এর কোন চিহ্নও খুঁজে না পায়। এবং সূর্যদেবকেও এই
কান্ড দেখে অসন্তুষ্ট হতে হবে না। তিনি এসব ব্যাপার মোটেই পছন্দ করেন না, রেগে
গিয়ে খরার সৃষ্টি করেন এবং তাতে ফসলের অনেক ক্ষতি হয়। কাজেই তিনি জেগে ওঠার আগেই
এসব সেরে ফেলতে হবে। যথেষ্ট গুরুত্ব এবং গাম্ভীর্য নিয়ে কালাটা এবার চারদিকে চোখ
বুলিয়ে নিলেন। যাদের ডাকা হয়েছিল তারা সবাই হাজির। পরিষদ সম্পূর্ন। তার চারদিকে
গোল হয়ে বসে হাই তুলছিল আর উকুন মারছিল ম্যানুয়েলা মামানি, ইনোন্সিও কাহুয়ানা,
নার্সিসো লোপেজ, টমাস কন্ডোরি, ইত্যাদিরা। এছাড়াও ছিল বাদী পক্ষে কার্মেলোর
শ্বশুর-শাশুরী এবং বৌ ইসিডোরা। কেলোপানার বৌ কার্লোটাও ছিল। ইসিডোরা ও কার্লোটা
দুজনেই মাকুয়েরার বোন। সুতরাং কেলোপানা হল কার্মেলোর ভায়রাভাই। এরকম ঘনিষ্ঠ
সম্পর্কের ফলে মামলাটা হয়ে দাঁড়াল সম্পুর্ণ আয়ত্তাধীন, আদালতের ভাষায় যাকে বলে “কেস
অ্যাট হ্যান্ড” বা আয়ত্তাধীন মামলা, ঠিক তেমন।
সম্পর্কের দিক থেকে
বাদী ও বিবাদি পক্ষের এই ঘনিষ্ঠতা দেখে কালাটার নৈতিক চিন্তাভাবনা এলোমেলো হয়ে
গেল। তাছাড়া এর কুপ্রভাব উপস্থিত সকলের মর্যাদাবোধে আঘাত করেছিল। এই অস্বস্তিকর
পরিস্থিতিকে কালাটা নিজের স্বার্থসিদ্ধির কাজে লাগানোর চেষ্টা করল। কালাটার
ইঙ্গিতে কোয়াহিলা যুবতী তার সঙ্গে আনা কোকো বের করে সবাইকে বিতরণ করতে শুরু করল।
কালাটার ইচ্ছানুযায়ী সে সবাইকে তা গ্রহণ করতে অনুরোধ করল আর বলল, “এই ব্যাভিচারের
জন্য আমাকেও আপনারা ক্ষমা করুন, এটাই প্রথম বার...”
তখন বৃদ্ধ কাহুয়ানা
বলল, “লেওন্সিও কেলোপানা, ইসিডোরা যা বলছে তা কি সত্যি?
কেলোপানা চুপচাপ দাঁড়িয়ে, মৃত্যুদন্ড
পাওয়া আসামীর মত অবনতমস্তকে সে উত্তর দিল, “হ্যাঁ, সব সত্যি। আমাকে ক্ষমা করুন। এটাই প্রথম বার।”
“তোমার
কি আর কিছুই বলার নেই?” কালাটার প্রশ্ন।
“কার্মেলোই
বলুক তার মর্যাদার জন্য কি মূল্য তাকে দিতে হবে।”
এবার কার্মেলো বলতে শুরু করল, “টেরাটায় আসতে যেতে
এর মধ্যেই আমার একশ’ মুদ্রা খসেছে। তার উপর আমার অ্যান্টনী কালিসায়ার বাজারদরটাই খুবই বেশী। কেলোপানাকে পাচশ” সোল দিতে বলুন!”
কালাটা বুঝলেন, এবার
সুযোগ এসেছে, “লেওন্সিও, যে অপরাধ করে তাকে
প্রায়শ্চিত্যও করতে হয়, বিশেষত তোমার অপরাধটা যখন ছোটখাট নয়,
সুতরাং তোমাকে কৃপন হওয়া সাজে না। কে বলেছিল তোমাকে অন্যের ঘাটে জল খেতে? তুমি
সেই জল কলুষিত করেছ। তোমাকেই তা
শুদ্ধ করতে হবে।”
“তিনশ’
দিলে কি চলবে না, পিতঃ কালাটা?
কালাটা যে অবাক হয়েছেন
তা চেষ্টা করেও লুকোতে পারলেন না, যদিও তা খুবই সামান্য। কার্মেলো তার দিকে একভাবে তাকিয়ে ছিল এবং সে-ই ব্যাপারটা
ধরতে পারল। দু’জনে পরস্পরের দিকে নিঃশব্দে
তাকাল এবং নিঃশব্দেই অনুমোদিত হয়ে গেল।
“ঠিক
আছে।” কালাটা গম্ভীর স্বরে বললেন, “যাও, টাকাটা নিয়ে এস।”
“ঠিক
এখনই তো দিতে পারব না। আমার কাছে অত
টাকা নেই। আগামীকাল আমি টারাটায় গিয়ে কারো কাছ থেকে
টাকাটা ধার করব।”
“তার
কোন প্রয়োজন নেই। আমি তোমাকে ধার দেব। কাহুয়ানাকে বলো একটা রসিদ লিখে দিতে আর তুমি তাতে সই করে দাও।”
কেলোপানা নিজেই নিজের
ফাঁদে পা দিল আর তার বৌ-ও এতে বেশ একটু অসন্তুষ্ট হয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“একটা ব্যাভিচারের জন্য তিনশ’ সোল, বিচার না অন্য কিছু!” অন্যেরা একইভাবে হাঁটু গেড়ে বসে
পরস্পরের কাছে মৌন ক্ষমা প্রার্থনা করল।
সভা শেষ হল। প্রত্যেকেই কার্মেলোকে অভিনন্দন জানাল আর মাকুয়েরার কাছ থেকে আরেকটু
কোকো চেয়ে নিল। মাকুয়েরা যুবতী অর্থাৎ ইসিডোরাকে বেশ
হাসিখুশি দেখাচ্ছিল। লেওন্সিওর দিকে চোখাচোখি তাকাতে তার আর
ভয় লাগছে না। তারপর সবাই বিদায় নিল, কিন্তু
তার আগে ইসিডোরাকে বলে গেল, “তুমি খুব ভাল বর পেয়েছ, ইসিডোরা। এবার থেকে সাবধানে থেকো।”
এবং কেলোপানাকে তারা বলল, এই যে বদমাস বেহায়া ভারতীয়,
আমার বৌয়ের দিকে নজর দিতে যেও না, মার খেয়ে মরবে।”
সবশেষে, যখন
মাকুয়েরাদের বিদায়ের সময় এল, কালাটা তার আনুষ্ঠানিক গাম্ভীর্য
ছেড়ে প্রত্যেকের সাথে কোলাকুলি করলেন, “মীমাংসাটা শেষ পর্যন্ত
ভালই হল, কি বল?” কার্মেলোকে বললেন,
“আমার ভাগেরটা কি হবে?”
“আপনি
যা বলবেন, পিতা।”
“পঞ্চাশ
সোল হলে কি তোমার আপত্তি থাকবে?”
“বেশ
তো, সেটাই রেখে বাকিটা আমাকে দিন।”
খোলা মাঠের মধ্যে দিয়ে
ফেরার সময় কার্মেলোকে বেশ খুশী খুশী দেখাচ্ছিল। পকেটে অনেক টাকা এখন তার। বহুদিন এত টাকা একসাথে দেখেনি। টাকার প্রভাবে তার একটু নেশা লাগছে। ইসিডোরাকে ধরে সে বলল, “দেখ, প্রতিমাসে যদি এরকম একটা করে ব্যাভিচার হয় তবে কিছুদিনের মধ্যেই আমরা বড়লোক
হয়ে যাব, কাইরানি গ্রামের সব জমিই আমরা কিনে নিতে পারব।”
“তাহলে,
তুমি বলছ, বাইরে একা বেরুনোর সময় আমার আর ছোরা
নিয়ে বেরুবার দরকার নেই?”