Saturday, 26 July 2014

শঙ্খচিল



ডেন্মার্কের গল্প
অনুবাদঃ দেব চৌধুরী

ইশাক ডাইনসেন
শঙ্খচিল

গভীর সমুদ্রে পাল তুলে শার্লট ভেসে চলেছিল মার্সেই থেকে এথেন্সের দিকে। মেঘলা আবহাওয়া, তিনদিনের ঝোড়ো হাওয়ার পরে। একটি অল্পবয়সী নাবিক, নাম তার সিমন, সে দাঁড়িয়েছিল ভিজে দোলখাওয়া ডেকের উপর রেলিঙে হেলান দিয়ে। একবার কি ভেবে আকাশের দিকে তাকাল। অমনি চোখে পড়ল উঁচু মাস্তুলের মাথায় একটি শঙ্খচিল আশ্রয় নিয়েছে। তার পা জড়িয়ে গেছে মাস্তুলের দড়ির আঁশে। ছাড়া পাওয়ার আপ্রান চেষ্টায় পাখীটা ডানা ঝাপটাচ্ছে সিমন দেখল। পাখীটা একসাথে ডানা ঝাপটাচ্ছে আর মাথা জোরে জোরে ঝাকাচ্ছে। 

নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে সিমন শিখেছিলঃ এই পৃথিবীতে প্রত্যেকে অবশ্যই নিজেই নিজেকে দেখবে, কারো সাহায্য ছাড়াই। কিন্তু  পাখীটার এই নিঃশব্দ সংগ্রাম দেখে সিমন মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। একবার সে অনেকদিন আগে তার নিজের গ্রামে সে এই রকম একটা শঙ্খচিল দেখেছিল - একটা পাথরেরে উপর বসে ছিল। সেখান থেকে সেটা সোজা উপরে উঠে গেল।

সিমনের মনে হোলো, পাখীটা ঠিক আমার মত - এখন এখানে আছে। আমার পরক্ষণেই হয়ত অন্য কোথাও।
পাখীটার জন্য তার কষ্ট হল। বেশ মনোযোগ দিয়ে পাখীটাকে দেখতে থাকল। ডেকে আর কেউ ছিল না, ভালই হল, থাকলে ওকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করত। যাইহোক, পাখীটাকে তো বাঁচাতে হবে। সিমন মাথার চুলের মধ্যে দু’হাতের আঙ্গুল চালিয়ে চুলগুলোকে পিছনে ঠেলে দিল। হাতা গুটিয়ে ডেকের চারদিকটা একবার দেখে নিল। তারপরই দড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল, ঝোড়ো বাতাসের মধ্যেই।

সিমন যখন মাস্তুলের মাথায় পাখীটার কাছে পৌঁছে গেছে, পাখীটা ডানা ঝাপটানো বন্ধ করে রাগরাগ হলদে চোখে তার দিকে তাকাল। সিমন এক হাতে পাখীটাকে ধরল আর অন্য হাতে ছুরি বের করে দড়ির আঁশগুলো কেটে ফেলল। অমনি নিচের দিকে তাকিয়ে তার একটু ভয় হোলো, কিন্তু একই সাথে তার মনে হোলো সে কারও নির্দেশে চালিত হয় নি বরং নিজেই স্বতস্ফুর্তভাবেই কাজটা করেছে, তাই মনেমনে একটা গর্ব বোধ হল। এক সাবলীল চেতনায় তার মনে হল এই আকাশ, এই সমুদ্র, জাহাজ, আর এই পাখীটা, আর সে নিজে - সবাই এক। ঠিক যখন পাখীটাকে মাস্তুল থেকে সে ছাড়িয়ে ফেলেছে, পাখীটা তার বুড়ো আঙুলে ঠুকরে দিল, রক্ত বেরুল, সিমন আরেকটু হলে পাখীটাকে ছেড়ে দিচ্ছিল। রেগে গিয়ে তার মাথায় একটা থাপ্পড় মারল, তারপর তাকে জ্যাকেটের মধ্যে পুরে নিচে নেমে এল।

সিমন যখন ডেকে এসে পৌঁছুল, জাহাজের মেট কয়েকজন তাকে লক্ষ্য করছিল। তাকে ধমক দিল, “কি করতে মাস্তুলে উঠেছিলে।” সে এত ক্লান্ত ছিল, তার চোখদুটো ছলছল করছিল। পাখীটাকে বের করে তাদের দেখাল। পাখীটা তার হাতের মধ্যে চুপটি মেরে ছিল। তারা ব্যাপারটা বুঝে হেসে উঠল আর যে যার নিজের কাজে চলে গেল। সিমন পাখীটাকে নিচে নামিয়ে রাখল আর একটু সরে দাঁড়িয়ে তাকে লক্ষ্য করতে লাগল। একটু বাদেই তার খেয়াল হোলো পিচ্ছিল ডেকে পাখীটার দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছে। তাকে তুলে নিয়ে একটা গোটানো পালের উপর বসিয়ে দিল। একটু বাদে পাখীটা ঠোঁট দিয়ে পালকগুলো ঠিক করতে লাগল, দুয়েকটা ঝাপটা মারল, আর তারপর হঠাৎ উড়ে গেল। সিমন পাখীটা দিকে তাকিয়ে রইল। পাখীটা উড়ে যাচ্ছিল ধুসর সমুদ্রের উঁচুনিচু ঢেউয়ের উপর দিয়ে। “ওই যে আমার শংখচিল উড়ছে।“ সিমন মনে মনে বলল।

শার্লট যখন বন্দরে ফিরল, সিমন আরেকটা জাহাজে কাজ নিল। দুই বছর পরে ‘হেবে’-নামের একটা দ্রুতগামী জাহাজে করে বোদো-বন্দরে পৌঁছল। ওখানকার হেরিং-মাছ খুব বিখ্যাত কিন্তু বেশ দাম, সিমনের অত পয়সা ছিল না।
বোদোর হেরিং-বাজারে জাহাজ আসত দূর-দূরান্ত থেকে। দেখা যেত সুডেন, ফিনল্যান্ড আর রাশিয়ার জাহাজ। অজস্র মাস্তুলের ভীড়। আর ডাঙায় দেখা যেত লাওয়ারিশ উচ্ছৃঙ্খল জীবনের প্রদর্শনী।
ডাঙায় অনেক অস্থায়ী দোকান বসেছিল। হলদে বেটে উপজাতি ল্যাপদের চলাফেরা ছিল শান্ত। সিমন আগে কখনো তাদের দেখেনি। তারা এসেছিল পুঁতির কাজ করা চামড়ার জিনিস বেঁচতে। এপ্রিলের আকাশ আর সমুদ্র এত পরিষ্কার যে তাকিয়ে থাকা যায় না - লবনাক্ত আর সীমাহীন তার বিস্তৃতি আর পাখীর তীক্ষ্ণ ডাকে সরগরম - যেন কেউ স্বর্গে বসে এক অদৃশ্য ছুরি ক্রমাগত ধার দিয়ে চলেছে।

সিমন বরাবর বয়সের তুলনায় কিছুটা ছোটখাট। কিন্তু গত শীতে সে একটু লম্বা হয়েছে আর গড়নটাও বেশ শক্ত হয়েছে। তার মনে হল : সৌভাগ্য উঠে আসবে এই মিস্টি আবহাওয়ার মতই একই ধরনের এক উৎস থেকে, বিশ্বের এক নতুন সৌহার্দ্য থেকে। তার এই ধরনের একটা উৎসাহের প্রয়োজন ছিল কেননা সে বরাবর ছিল শান্ত স্বভাবের। এখন অবশ্য সে আর কিছু চায় না। বাকীটা সে মনে করে তার নিজের ব্যাপার। সে এগিয়ে চলল শান্ত, গর্বিত, ধীরগতিতে। 
একদিন সিমন ছুটি নিয়ে ডাঙায় উঠল। এক রুশ ব্যাবসায়ীর দোকানে গেল। একজন ইহুদি কিছু সোনার ঘড়ি বিক্রি করছিল। সবাই জানত ঘড়িগুলো নকল সোনার, তাও সেগুলো তারা কিনে নিয়ে চলল। সিমন অনেকক্ষণ ধরে দেখল কিন্তু একটাও কিনল না। দোকানে আরও অনেক রকমের জিনিস ছিল। তার মধ্যে ছিল একটা কমলালেবুর বাক্স। সিমনে জাহাজে আসার সময় কমলালেবু খেয়ে দেখেছে। তাই ওটাই একটা কিনে নিল। ঠিক করল একটা পাহাড়ে গিয়ে উঠবে যেখান থেকে সমুদ্র দেখা যায়। আর সেখানে বসে লেবুটা চুষবে।

তেমন একটা পাহারের খোঁজে হাঁটতে হাঁটতে বাজার-এলাকার বাইরে চলে গিয়েছিল সিমন, চোখে পড়ল এক কিশোরী নীল জামা পরে বাড়ির বেড়ার বাইরে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। বয়স হবে তের কি চোদ্দ, ছিপছিপে বাণমাছের মত গড়ন। কিন্তু মুখটা গোলগাল, ফর্সা, চিবুকে একটা তিল। আর দুটো লম্বা বেনী ঝুলছে। দু’জনের চোখাচুখি হল। নিছক কিছুটা একটা বলার জন্যই সিমন বলল, “তুমি কাকে খুঁজছ গো?”

মেয়েটার মুখে এক সাবলীল অর্থপূর্ণ হাসি ছড়িয়ে পড়ল। বলল, “খুঁজছি, আমার বরকে।”

মেয়েটার মুখের ভাবে সিমন একটু আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল। খুশী হল। ঠোঁট কামড়ে তার দিকে তাকাল। বলল, “সে বোধহয় আমিই।” এহ ! সে নিশ্চয়ই তোমার চেয়ে বড় হবে, মেয়েটি বলল, আমি লিখে দিতে পারি”। “কেন? সিমন বলল, তুমি নিজেই তো এখনো বড় হও নি”। মেয়েটি মুখভার করে মাথা নাড়ল, “তা ঠিক, কিন্তু আমি যখন বড় হব, আমি দেখতে খুব সুন্দর হল। বাদামী রঙের একটা হিল তোলা জুতো পরব, আর একটা টুপি”।

সিমনের দেবার বলতে একটা কমলালেবু ছিল। সেটাই এগিয়ে দিল, “তুমি কমলালেবু খাবে?” মেয়েটি লেবুটার দিকে তাকাল। সিমনকে দেখল। সিমন বলল, “এটা খেতে খুব সুন্দর”। মেয়েটি প্রশ্ন করল, “তাহলে তুমি নিজেই ওটা খাচ্ছ না কেন?” সিমন বলল, “এথেন্সে থাকতে আমি তো  অনেক খেয়েছি। এখানে এটা কিনতে এক মার্ক খরচ হয়েছে”। মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, “তোমার নাম কি?” “আমার নাম সিমন, সে বলল, আর তোমার?” “আমার নাম নোরা, মেয়েটি বলল, সিমন, কমলালেবুটার জন্যে তুমি কি নেবে?”

সিমন তার নিজের নাম মেয়েটির মুখ থেকে শুনে সাহস পেয়ে গেল, বলল, “তুমি কি কমলালেবুটার জন্যে আমায় একটা চুমু দেবে?” নোরা ভারী চোখে তার দিকে তাকাল একটি মুহুর্ত। বলল, ‘হুঁ, তা দিতে আমার আপত্তি নেই”। সিমন একটু ঘামতে শুরু করেছে যেন অনেকদূর দৌড়ে এসেছে। লেবুটার জন্য মেয়েটি হাত বাড়িয়েছে এমন সময় কে যেন বাড়ির ভিতর থেকে ডাকল। “আমার বাবা,” নোরা বলল, আর কমলালেবুটা ফিরিয়ে দিতে চাইল কিন্তু সিমন রাজী হল না। মেয়েটি ঝটপট বলল, “তাহলে কালকে এসো, তোমার পাওনাটা তুমি পেয়ে যাবে।” এই বলে সে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে চলে গেল। সিমন দাঁড়িয়ে থেকে তার চলে যাওয়া দেখল। আর কিছু পরে সে জাহাজে ফিরে এল।

পরদিন সন্ধ্যায় তাকে জাহাজেই থাকতে হয়েছিল কারন অন্য নাবিকরা ডাঙ্গায় যাচ্ছিল, আর তাতে তার আপত্তিও ছিল না। সিমন ঠিক করল জাহাজের কুকুর বালথাজারকে নিয়ে সে ডেকে বসবে আর নতুন কেনা কনসার্টিনা নিয়ে একটু সঙ্গীতচর্চা করবে। বিবর্ণ সন্ধ্যা নেমেছে চারদিক জুড়ে, আকাশে নিস্প্রভ আবীর ছড়িয়ে দিয়েছে কে যেন। সমুদ্র শান্ত চুপচাপ - শুধু তীরগামী নৌকোগুলোর চলাফেরায় এই শান্তভাব কেটে গিয়ে তৈরি হচ্ছিল নীল-বেগুনী রেখার নকশা। সিমন বসে কনসার্টিনা বাজাতে লাগল। একটু পরে বাজনা এত জোরে বাজতে শুরু করল যে সিমন থেমে গেল। উঠল। আকাশের দিকে তাকাল। আকাশে নিষ্কর্মা ঢাউস চাঁদটা বসে আছে।

আকাশটা এত উজ্জ্বল যে ওখানে ওই চাঁদটার কোন দরকার আছে বলে মনে হচ্ছিল না। যেন সে জোর করেই ওখানে এসে জুড়ে বসেছে, বৃত্তাকার সাবলীল চাঁদটা খুব অহংকারী। সিমন ঠিক করল সে ডাঙায় যাবেই, যে করেই হোক। কিন্তু কিভাবে যাবে, ডিঙিনৌকোগুলো তো অন্যরা ডাঙায় নিয়ে গেছে!

সিমন একাকী অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিল, জাহাজের ডেকে নিঃসঙ্গ কিশোর-নাবিকের ছবি হয়ে। অবশেষে দেখল অন্য একটা জাহাজ থেকে একটা ডিঙিনৌকো ডাঙার দিকে এগোচ্ছে। চেঁচিয়ে হাক দিল। কাছাকাছি এলে বুঝল সেটা ছিল একটা রাশিয়ার জাহাজের। তারা ওকে সঙ্গে নিয়ে নিল। প্রথমে অর কাছ থেকে পয়সা নিয়েছিল, পরে আবার হেসে সেটা ফেরত দিয়েও দিয়েছিল। সিমন ভাবল, “এই লোকগুলো ভাবছে যে আমি শহরে যাচ্ছি নারীসঙ্গের উদ্দেশ্যে।”  তারপরে সে ভাবল, “ওরা তো ঠিকই ভাবছে, যদিও একই সঙ্গে, তারা যা ভাবছে তা সম্পূর্ণ ভুল। তারা আসলে কোন বিষয়েই কিছুই জানে না।”

ডাঙায় নামার পর ওরা ওকে ওদের সঙ্গে মদ খেতে ডাকল। সিমন আপত্তি করল না কারন ওরা তার একটা উপকার করেছে। সে রুশ নাবিকদের মধ্যে একজন ছিল একটা দৈত্য-বিশেষ, ভালুকের মত বিশাল চেহারা। সে সিমনকে বলল, “আমার নাম ইভান।”  মদ খেতে খেতে সে একসময় মাতাল হয়ে পড়ল আর ভালুকের মত স্নেহে সিমনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, তাকে জড়িয়ে ধরল, তার মুখের দিকে তাকিয়ে একবার মৃদু এবং একবার অট্টসুরে হাসল। তাকে একটা সোনালী ঘড়ির চেন উপহার দিল। তার দু’গালে চুমো দিল। হঠাৎ সিমনের মাথায় এসে গেল যে নোরার সঙ্গে দেখা হলে তাকেও একটা উপহার দেওয়া উচিৎ। সে তাড়াতাড়ি বিদায় নিয়ে সোজা চলে গেল তার চেনা দোকানটায়, আর নোরার চোখের যে নীল রঙ, তার সাথে মানানসই একটা নীল রঙের সিল্কের রুমাল কিনল।

সেদিনটা ছিল শনিবার। বাড়িগুলোতে অনেক লোকের সমাগম হয়েছে। তাদের কেউ কেউ গান গাইছে। সারারাত ফুর্তি চলবে। এই অভিজাত গমগমে জীবনের মধ্যে দাঁড়িয়ে সিমনের মনে হল মাথাটা মদের নেশায় বেশ জাহাজের পতাকার মত হালকা লাগছে। রুমালটাকে ঠেলে পকেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল; ওটা সিল্কের। সে নিজে কখনো সিল্ক ধরে দেখে নি। ওটা উপহার তার বান্ধবীর জন্য।

নোরার বাড়ির রাস্তাটা সে মনে করতে পারছিল না, পথ হারিয়ে ফেলল, আর যেখান থেকে শুরু করেছিল সেখানেই ফিরে এল। তার ভয় হল দেরী হয়ে যেতে পারে। সে দৌড়তে শুরু করল। দুটো কুড়েঘরের মাঝখান দিয়ে যাওয়ার সময় এক দৈত্যাকার মানুষ তার সামনে পড়ল, ইভান। সিমনকে সে জাপটে ধরল, “আহা! এবার তোকে পেয়েছি রে, আমার ছোট্ট পাখী। তোকে আমি সব জায়গায় খুঁজেছি। বেচারা ইভান তার বন্ধুকে হারিয়ে কেঁদেছে।”  সিমন চিৎকার করে উঠল, “আমাকে যেতে দাও।” “ওহো, আমি তোর সঙ্গে যাব আর তুই যা চাস তাই পাইয়ে দেব। আমার দিল, আমার পয়সা, সব তোর জন্যে। একদিন আমি নিজেও তোর মত ছিলাম রে। যেন ভগবানের একটা পুচকে বাচ্চা। আর আজ রাতেও আমি সেরকম হয়ে যেতে চাই।”  সিমন চিৎকার করে উঠল, আমাকে যেতে দাও। আমার তাড়া আছে।” ইভান তাকে এত জোরে চেপে ধরে ছিল যে তার লাগছিল। আর অন্য হাতে চাপড় দিচ্ছিল, “আমি বুঝি, আমি তা বুঝি, সে বলল, আমাকে বিশ্বাস কর, তুই আর আমি কিছুতেই আর আলাদা হব না। আর সব বন্ধুদের আসার শব্দ পাচ্ছি। আজ আমরা এমন একটা রাত উপভোগ করব যে তুই যখন ঠাকুর্দা হবি তখনো তোর মনে পড়বে।” হঠাৎ ইভান সিমনকে জাপটে ধরে কোলে তুলে নিল, যেভাবে ভালুক ভেড়াকে তুলে নেয়। মানুষটার বিশাল শরীর আর পুরুষদেহের উষ্ণতার বিরক্তিকর অনুভুতি তাকে পাগল করে দিল। নোরার কথা মনে পড়ল। নোরা অপেক্ষা করে আছে আর সে নিজে এখানে একটা লোমশ পশুর কোলে আটকা পড়েছে। সমস্ত শক্তি দিয়ে ইভানকে সে আঘাত করল, “তোমাকে মেরে ফেলব ইভান, যদি আমাকে যেতে না দাও।” “ওহো, তুমি পরে আমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে,” ইভান বলল, আর গান গাইতে শুরু করল। সিমন পকেট হাতড়াল আর ছোরাটা বের করে খুলে ফেলল। হাতটা সে উপরে তুলতে পারছিল না বটে, কিন্তু তার হাতের নীচ দিয়েই ছোরাটা চালিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল। ইভান গান থামিয়ে তাকে ছেড়ে দিল আর দু’বার দুটো দীর্ঘ আর্তনাদ করল। তারপরেই সে হাটুগেড়ে বসে পড়ল আর “ও ইভান, হায় ইভান,” বলে মুখ থুবড়ে পড়ল। ঠিক তখুনি সিমন শুনতে পেল অন্য নাবিকরা গান গাইতে গাইতে সেদিকে আসছে।

সিমন এক মুহুর্ত দাঁড়াল, ছোরাটা মুছে ফেলল, আর তাকিয়ে দেখল পড়ে থাকা বিশাল দেহটার নীচে রক্ত ছড়িয়ে জমাট বাঁধছে। সে দৌড় দিল।  দৌড়তে দৌড়তে একটু থামল, তখনই শুনতে পেল রুশ নাবিকরা তাদের মৃত বন্ধুর নাম করে চিৎকার করছে। ভাবল, “সমুদ্রের দিকে যাব। হাতটা ধুয়ে ফেলতে হবে।” কিন্তু দৌড়ল সে উল্টোদিকে। একটু বাদেই দেখল সে আগের দিনের রাস্তায় এসে পড়েছে। রাস্তাটা তার চেনা লাগল যেন জীবনে বহুবার সে এই পথে হেঁটেছে।
রাস্তাটার এদিক-ওদিক দেখে নিতে সে গতি কমাল, আর তখনই দেখল নোরা দাঁড়িয়ে আছে বেড়ার পাশে; চাঁদের আলোয় যখন তাকে দেখতে পেল, সে একেবারে কাছে এসে পড়েছে। থমকে, দম হারিয়ে, সে হাটু গেড়ে বস পড়ল। কিছুক্ষণ সে কথা বলতে পারল না। মেয়েটি তার মুখের দিকে তাকাল। হালকা লাজুক গলায় বলল, “শুভসন্ধ্যা সিমন, আমি তোমার জন্য অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিলাম।”  একটু থেমে বলল, “আমি তোমার দেওয়া কমলালেবুটা খেয়েছি।”
“ওহ্‌ নোরা!” ছেলেটি চিৎকার করে বলল। “আমি একটা লোককে খুন করেছি।” মেয়েটি তার মুখের দিকে তাকাল, কিন্তু নড়ল না। বলল, “তুমি খুন করেছ? কেন?” “এখানে আসার জন্যে, সিমন বলল, লোকটা আমাকে আটকাতে চেস্টা করছিল। কিন্তু সে আমার বন্ধু ছিল।” আস্তে আস্তে সে উঠে দাঁড়াল। “আমাকে ভালবাসত,” সে চিৎকার করে উঠল, তার চোখদুটো জলে ভরে গেল। “হ্যাঁ,” ধীরে, ভাবতে ভাবতে মেয়েটি বলল, “কেননা তোমাকে ঠিক সময়ে এখানে আসতে হবে।” “আমাকে লুকিয়ে রাখতে পারো, নোরা? ওরা আমাকে তাড়া করেছে।” ছেলেটি বলল। কিন্তু মেয়েটি উত্তর দিল, “না, সেটা সম্ভব নয়। আমার বাবা এখানকার যাজক। তিনি ব্যাপারটা জানতে পারলে অবশ্যই তোমাকে তাদের হাতে তুলে দেবেন।” তাহলে আমার হাতটা মুছে ফেলার মত কিছু দাও,” বলল সিমন। “কেন? হাতে কি হল?” বলে নোরা এক পা এগিয়ে গেল। সিমন তার হাতটা বাড়িয়ে দিল। নোরা জিজ্ঞেস করল, “ওটা কি তোমার রক্ত?” “না, লোকটার,” সিমন বলল। মেয়েটি বলল, “সিমন, আমি তোমাকে ঘৃনা করি না। শুধু তোমার হাতটা পিছনে রাখো।”

সিমন তাই করল। নোরা বেড়ার এপাশে তার কাছে এল। তার কাঁধে হাত রেখে তাকে জড়িয়ে ধরল। ঠোঁটে ঠোঁট মেলাল। চাঁদের আলোয় নোরার শান্ত মুখটা সিমন নিজের মুখের উপর অনুভব করল। মেয়েটি যখন নিজেকে ছাড়িয়ে নিল, সিমনের মাথাটা দুলছিল। সে জানত না কতক্ষণ সেই চুম্বন স্থায়ী ছিল। নোরা সোজা হয়ে দাঁড়াল তার নীল চোখ মেলে তাকাল। বলল, “এখন, আমি কথা দিলাম, আর কাউকে আমি বিয়ে করব না।“ সিমন পিছনে হাত সেভাবেই রেখে দাঁড়িয়েছিল যেন মেয়েটি যার নাম নোরা সে তাকে বেঁধে রেখেছে। মেয়েটি হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠল, “সিমন পালাও। ওরা আসছে।“ দু’জনে দু’জনের দিকে তাকাল। মেয়েটি বলল, “নোরাকে মনে রেখ।” সিমন ঘুরে দাঁড়িয়ে দৌড় দিল।

কিন্তু পালিয়ে কোথায় যাবে তা সে জানত না। একটা বাড়ির ভিতর থেকে গান-বাজনা হৈ-হুল্লোর ভেসে আসছিল। সিমন দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে পড়ল। ঘরটা লোকে ভরতি। সবাই নাচছে। সিলিং থেকে একটা ঝাড়বাতি ঝুলছে, তার আলোয় মেঝের ধুলোয় বাতাস ভারী হয়ে আছে। একটু পরে ঘরের মাঝখানে দু’জন নাবিক তাদের দেশের নাচ শুরু করল। ভীড়টা তাকে ঠেলে নিয়ে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল।

সিমন চিন্তা করল, “এক্ষুনি সেই লোকগুলো তাদের বন্ধুর খুনীকে খূঁজতে এখানে চলে আসবে আর আমার হাতের রক্ত দেখলেই তারা খুনীকে চিনে ফেলবে।” নাচঘরের জাঁকজমক, ঘেমে ওঠা নর্তক-নর্তকীরা, এদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এই সামান্য সময় তার কাছে বেশ অর্থপূর্ন হয়ে উঠল। সে উপলব্ধি করল এই অল্প সময়ের মধ্যে সে বেশ বড় হয়ে গিয়েছে। নিয়তির কাছে সে কোন প্রার্থনা বা নালিশ জানাল না। সে একটা মানুষকে খুন করেছে। একটি মেয়ের চুম্বন পেয়েছে। জীবনের কাছে তার আর কিছু চাওয়ার ছিল না অথবা জীবনও তার কাছে আর কিছু চায় নি। তার নাম সিমন, একজন সম্পূর্ন মানুষ। ঠিক তার চারপাশের অন্যদের মত। এবং সে মরতে চলেছে যেমন সবাই একদিন মরবে।

এইসব ভাবতে ভাবতে সে যখন ঘোর কাটিয়ে চারদিক তাকাল, দেখল ঘরের মাঝখানে ফাঁকা জায়গার ঠিক মধ্যিখানে একজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। বেটেখাট চেহারার ল্যাপ উপজাতির একজন স্থুলকায়া বৃদ্ধা মহিলা। তিনি চারদিকে তাকিয়ে দেখছেন। এমন রাজকীয় গম্ভীর ভঙ্গিতে হাত তুললেন যেন জায়গাটা তাঁর। বোঝা গেল ঘরের প্রায় সবাই তাকে চেনে এবং সমীহ করে চলে, যদিও কয়েকজন হাসছিল।

পাখীর মত তীক্ষ্ণ কাঁপা গলায় তিনি বললেন, “আমার ছেলে কোথায়?” পরমুহুর্তেই তার চোখ পড়ল সিমনের উপর। ভীড়ের মধ্যে দিয়ে তার দিকে তাকালেন। বার্ধক্যের খসখসে কালো হাত বাড়িয়ে তাকে টেনে নিলেন। বললেন, ‘আমার সঙ্গে চলো। আজ রাতে তোমার এখানে নাচার দরকার নেই। আরও ভাল নাচ তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে।”  

সিমন পিছিয়ে এল। ভাবল তিনি বুঝি মাতাল। কিন্তু তিনি যখন তাঁর হলদে চোখে তার দিকে তাকালেন, সিমনের মনে হল সে আগে কোথাও তাকে দেখেছে। মনে হল তাঁর কথা শুনে চলাই ভাল। আর একটি কথাও না বলে তাকে অনুসরন করল। ভিড়ের মধ্যে থেকে কে একজন চেচিয়ে বলল, “সুনিভা, ওকে খুব মারধোর করো না কিন্তু। ও কোন ক্ষতি করে নি, শুধু নাচ দেখতে এসেছিল।“

দরজার বাইরে আসতে একটা বিপদের আভাস পাওয়া গেল। একদল লোক দৌড়ে আসছিল। তাদের একজন বাড়িটার দিকে তাকাতে গিয়ে সিমনের সাথে ধাক্কা খেল। তাকে আর বৃদ্ধাকে দেখে আবার দৌড় দিল।

রাস্তায় যেতে যেতে স্কার্টের খুট তুলে বৃদ্ধা সিমনকে বললেন, “হাতটা এতে মুছে ফেল।” কিছু দূর হেঁটে তারা একটা ছোট কাঠের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। বাড়ির দরজাটা ছিল খুব নিচু। তারা কুঁজো হয়ে ভিতরে ঢুকল, কিন্তু তখনও বৃদ্ধা তার হাতটা ধরে রেখেছিলেন। তিনিই আগে ঢুকলেন। সিমন একমুহুর্ত আকাশের দিকে তাকাল। রাতের কুয়াশা বেড়েছে। চাঁদের চারদিকে একটা বৃত্ত।

বৃদ্ধার ঘরটা ছিল বেশ ছোট। আলো কম। একটি খোলা জানলা। মেঝের উপর একটা বাতি টিমটিম করে জ্বলছে। ঘরের মধ্যে স্তুপ হয়ে আছে বুনো হরিণ আর নেকড়ের চামরা। আর ছিল হরিণের শিঙ বোতাম আর ছিরি বানানোর জন্যে। ভ্যাপসা গন্ধ ভরা গুমোট বাতাসে ঘরটা ভরে ছিল।

ঘরে ঢুকেই বৃদ্ধা সিমনের মাথার চুলে বিলি কেটে ল্যাপ কায়দায় আচরে দিলেন। এক ঝলক তাকে দেখলেন। “এই টুলটাতে বসো, তিনি বললেন, আর আগে তোমার ছুরিটা বের করো।” তার ভঙ্গিমা আর কন্ঠস্বর এত গম্ভীর ছিল যে সিমন তাঁর নির্দেশ অমান্য করতে পারল না। টুলে বসেই শুনতে পেল বাইরে অনেক লোক বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। একজন দরজায় টোকা দিল। বৃদ্ধা যেন ইঁদুরের মত চুপচাপ দাঁড়িয়ে শব্দটা শুনলেন।

সিমন উঠে দাঁড়াল, “না। এটা ঠিক হচ্ছে না। ওরা আমাকে খুঁজছে।” তার কথায় কান না দিয়ে বৃদ্ধা বললেন, “তোমার ছুরিটা আমায় দাও।” ছোরাটা নিয়েই তিনি নিজের বুড়ো আঙ্গুলে চালিয়ে দিলেন আর রক্তটা নিজের স্কার্টে ছড়িয়ে নিলেন। তারপর দরজার দিকে তাকিয়ে চেচিয়ে বললেন, “ভিতরে আসতে পারেন।”

দরজাটা খুলে গেল। দু’জন রুশ নাবিক দরজার সামনে দাঁড়াল। বাইরে আরো অনেকে ছিল। “এখানে কেউ ঢুকেছে? ওরা জিজ্ঞেস করল, আমাদের বন্ধুর খুনীকে আমরা খুঁজছি। আপনি কী এখান দিয়ে কাউকে যেতে দেখেছেন বা শুনেছেন?” বৃদ্ধা তাদের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখদুটো বাতির আলোয় সোনার মত জ্বলছিল। তিনি চিৎকার করে উঠলেন, “আমি কাউকে দেখেছি বা শুনেছি কিনা? আমি সারা শহর জুড়ে তোমাদের চেঁচিয়ে মরতে শুনেছি। তোমাদের চিৎকার আমাকে আর আমার ছেলেকে এত ভয় পাইয়ে দিয়েছে যে নতুন সেলাই করা আসনটা কাটতে গিয়ে আমি আমার হাত কেটে ফেলেছি। ছেলেটা আমাকে সাহায্য করার পক্ষে খুবই ছোট। আমার পুরো আসনটা রক্ত পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এর জন্যে তোমাদের ক্ষতিপূরন দিতে হবে। তমরা যদি খুনিকে খুঁজতে চাও তো ভিতরে এসে খুঁজে দেখ। পরে তোমাদের সাথে বোঝাপড়া হবে।”  বৃদ্ধা এত রেগে গিয়েছিলেন যে ঘরময় লাফঝাঁপ শুরু করে দিয়েছিলেন। মাথাটা ঝাঁকাচ্ছিলেন এক ক্রুদ্ধ শিকারি পাখীর মত।

রুশ নাবিকটি ভিতরে এসে চারদিকটা দেখল, বৃদ্ধা মহিলাকে, তাঁর রক্তাক্ত হাত আর স্কার্টটা দেখল। এবং খুব বিনীতভাবে বলল, “আমাদের অভিশাপ দেবেন না, সুনিভা। আমরা জানি আপনি ইচ্ছা করলে অনেক কিছু করতে পারেন। আপনার রক্তপাতের জন্য এই মার্কটা রাখুন।” বলে সে একটা কাচা মুদ্রা বৃদ্ধার হাতে রাখল। বৃদ্ধা সেটা রেখে দিয়ে বললেন, “এখন কেটে পড়ো, তাহলেই আমাদের মধ্যে আর কোন গোলমাল থাকবে না।” তারা বেরিয়ে যেতেই বৃদ্ধা দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। রক্তাক্ত আঙ্গুলটা মুখে নিয়ে চুষলেন।

সিমন টুল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সোজা উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে তাকাল। মনে হল তার মাথাটা দুলছে, “আপনি আমায় কেন বাঁচালেন?” “কেন, জানো না?” বৃদ্ধার পাল্টা প্রশ্ন, “তুমি কী আমাকে এখনো চিনতে পারো নি? তবে সেই শঙ্খচিলটার কথা তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে! ভুমধ্যসাগরে তোমার শার্লট জাহাজের মাস্তুলে যে আটকে পড়েছিল। সেই অশান্ত সমুদ্রে ঝোড়ো বাতাসের মধ্যেও দড়ি বেয়ে উঁচু মাস্তুলে উঠে তুমি তাকে বাঁচিয়েছিলে। আমিই সেই শঙ্খচিল। আমরা ল্যাপ-উপজাতিরা মাঝেমাঝে এইভাবে দেশভ্রমণ করি। সে-বার আমি যাচ্ছিলাম আফ্রিকায় আনার বোন আর তার ছেলেমেয়েদের দেখতে। সেও ইচ্ছে করলে শঙ্খচিল হতে পারে।” বৃদ্ধা তার কাটা আঙুলটায় স্কার্টের খুট জড়ালেন। একটু দাঁতে কামড়ালেন। “আমরা ভুলে যাই না। সেই উঁচু মাস্তুলে উঠে তুমি যখন আমাকে ছাড়াতে যাচ্ছিলে, আমি তোমার আঙুলে ঠুকরে দিয়েছিলাম। তাই আজ রাতে তোমার জন্যে আমার আঙুল কেটে দেওয়া ঠিক কাজই হয়েছে।”

বৃদ্ধা তার কাছে এসে পাখীর থাবার মত দুটো আঙুল দিয়ে তার কপালে আলতো করে ঘষে দিলেন। বললেন, “তুমি এমন এক ছেলে যে তার প্রেমিকার কাছে পৌঁছতে দেরী হয়ে যাচ্ছে বলে একজনকে খুন করে ফেলতে পারে। আমরা পৃথিবীর মেয়েরা সবাই এক। আমি তোমার কপালে এমন এক চিহ্ন করে দেব যাতে মেয়েরা দেখলেই বুঝতে পারবে। এর জন্য তারা তোমাকে পছন্দ করবে।” এই বলে তিনি সিমনের চুলের কিছুটা  আঙ্গুল দিয়ে কুকড়ে দিলেন।

এখন আমি যা বলছি শোন !” বৃদ্ধা বললেন, “আমার নাতির শালা ঠিক এখন বন্দরে পৌঁছে গেছে। ওর চামরার বোঝাটা ডেনমার্কের জাহাজে তোলার কথা। তোমার সঙ্গীদের আগেী ও তোমাকে জাহাজে পৌঁছে দেবে। ‘হেবে’ জাহাজটা তো কাল সকালেই ছাড়ছে, তাই না? তবে জাহাজে উঠেই কিন্তু আমার টুপিটা তাকে দিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দেবে।” বৃদ্ধা সিমনের ছুরিটা বের করে নিজের স্কার্টে মুছে তাকে ফেরত দিয়ে বললেন, ‘এটা দিয়ে আর কাউকে খুন কোরো না। যদিও সে দরুকারও আর হবে না কারন এখন থেকে তুমি একজন বিশ্বস্ত নাবিক হুয়েই সমুদ্রে ঘুরে বেড়াবে।”

সিমন ধন্যবাদ দিতে গিয়ে তোতলাতে শুরু করল। “দাঁড়াও, বৃদ্ধা বললেন, তোমার মেজাজ ফিরিয়ে আনতে তোমাকে এক কাপ কফি করে খাওয়াচ্ছি।“ বলে বৃদ্ধা একটা তামার কেটলি উনুনে চাপিয়ে দিলেন। একটু বাদে একটা হাতলছাড়া কাপে তাকে কফি দিলেন। বললেন, “এবার তুমি সুনিভার সাথে কফি পান করে কিছুটা জ্ঞানী হলে। ফলে ভবিষ্যতে তোমার ইচ্ছেগুলো ব্যর্থতায় ঝরে যাবে না।”

কফি শেষ করে সিমন কাপটা রাখল। বৃদ্ধা তাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। বাইরে এসে সিমন দেখল বেশ সকাল হয়ে গেছে। বাড়িটা এত উঁচুতে ছিল যে, সমুদ্র দেখা যাচ্ছিল। ধুসর কুয়াশা ছিল। বৃদ্ধাকে বিদায় দিতে সিমন হাত বাড়িয়ে দিল।
বৃদ্ধা তার মুখের দিকে তাকালেন। বললেন, “আমরা কখনো ভুলে যাই না। সেবার মাস্তুলের উপরে তুমি আমার মাথায় আঘাত করেছিলে। সেটা এখন তোমায় ফিরিয়ে দেব।” বলে তার গালে এমন কষে চড় মারলেন, তার মাথা ঘুরে গেল। 

“এখন সব শোধ হয়ে গেল।” বলে এক সাংঘাতিক উজ্জ্বল চোখে তাকালেন, তাকে দরজার বাইরে এগিয়ে দিলেন আর মাথা নেড়ে বিদায় জানালেন।

এইভাবে সিমন তার জাহাজে ফিরে গেল আর গল্পটা বলার জন্য সে অনেকদিন বেঁচে থাকলো।   


☺ শেষ

No comments:

Post a Comment