নকল নাস্তিক
আমি আস্তিক? নাস্তিক? প্রগতিশীল? রক্ষণশীল? বিপ্লবী? দালাল?
– প্রশ্নগুলোই অবান্তর। ভদ্রসমাজে সুবিধার লোভে আমি আস্তিক।
ঘি-চপচপ খিচুড়ির লোভে লোকনাথের মন্দিরে প্রণাম করি। আবার নিজেকে নাস্তিক বোঝানোর
জন্যে এমন সব আচরণ করি যা কোন আস্তিক আদৌ সাহস পাবে না। (অবশ্য নকল আস্তিক,
অপধার্মিক, যেমন, আমাদের এখনকার প্রধানমন্ত্রী/মুখ্যমন্ত্রী, এঁ হেন মহাপ্রতিভাবানদের
সাথে চ্যালেঞ্জ করার সাহস আমার নেই)।
এটা লিখতে গিয়ে একটা নতুন ঝামেলায় পড়ে গেলাম। “নকল
আস্তিক”-কে নাস্তিক বললাম না কেন? তাহলে “নকল নাস্তিক”-কে আস্তিক বলব না কেন? অথবা
মাকু বলব না কেন? আর, কেউ নাস্তিক হলেই তাকে মাকু বলা হবে কেন? মাকু হলেই তাকে
নাস্তিক বলে ধরে নেওয়া হয় কেন? আমার এক মাকু-বন্ধু আছেন যিনি পেশায় পুরোহিত,
জ্যোতিষী ও তান্ত্রিক; এবং তাঁর ক্লায়েন্টগন সকলেই মাকু। তিনি যেসব বাড়িতে পুজোর
অর্ডার পান তাদের সকলেই মাকুব্রাহ্মণ অথবা মাকুকায়স্থ ইত্যাদি। আর
তাছাড়া, আমার কথায় কি আসে যায়? লোকে যারে মাকু বলে, মাকু সেই হয়।
আর মাকু হলেই তাকে সিপিএম বলা হবে কেন? দেশে কি নকশাল বলে
কিছুই কোনদিন ছিল না? উপরন্তু, নাস্তিক হলেই তাকে ফুল-নাস্তিক বলে ধরে নেওয়া হয়,
এটাই বা কেন? হাফ-নাস্তিক বলে কি কিছু থাকতে নেই? বিশ্বাস ভাঙতে কি একটু সময় লাগে
না। সুপ্রিম পাওয়ার-এর অস্তিত্বকে অস্বীকার করা কি অতই সহজ? আমার নিজের এই কাজে
সময় লেগেছে আঠার বছর।
এদিকে আবার ফুল-নাস্তিক হলেই সিপিএমের লোকরা তাকে নকশাল বলে
গাল দেয় – কী বিড়ম্বনা বলুন তো ! তাহলে আমি যে বলি - ½ আস্তিক + ½ মাকু = 1 সিপিএম, সেটা কি ভুল বলি? এতগুলো বছর মাকুরেজিম-এ
কাটিয়েছি, ফুল-নাস্তিক হলে সেটা কি পারতাম? তাছাড়া, ফুল-নাস্তিক হয়ে ভদ্রসমাজে,
মাইরি বলছি, মেশা যায় না। জীবনের অনেকগুলো বছর প্রাইভেট টিউশানি করে পেট চালিয়েছি,
ফুল-নাস্তিক হলে সেটা খুব কঠিন হত। ভদ্রলোকরা ফুল-নাস্তিকদের সাথে এমনিতে ভদ্রভাবেই
কথা বলে, কিন্তু মাঝখানে একটা অদৃশ্য দেয়াল দাড় করিয়ে রাখে।
যাইহোক। এবার আসল কথায় আসি।
কয়েকদিন আগে ফেসবুকে একটা জন্মদিনের নোটিফিকেশন পেলাম, যেমন
প্রায়ই পেয়ে থাকি। কিন্তু এবারেরটা এমন একজনের, যে ফেসবুকে থাকলেও মাটির পৃথিবী
ছেড়ে চলে গেছে গতবছর তার জন্মদিনের মাসখানেক আগে। সুতরাং আরো মাসখানেক পরে তার
মৃত্যুদিন, যদিও তার মৃত্যুদিনের নোটিফিকেশন ফেসবুকে আসবে না। মৃত্যুদিন সে তার
প্রোফাইলে দিতে পারে নি। ফেসবুক একটি সোশ্যাল নেটওয়র্ক, শুধুমাত্র ইহলোকের জন্য, পরলোকবাসীদের
জন্যে নয়। ফেসবুকে ইহলোকের ঈশ্বরবাদীরা যতই তর্ক চালাতে থাকুন, কোন বিদেহী আত্মা
প্লানচেট অথবা আধুনিক প্রযুক্তি অথবা কোন স্বর্গীয় দৈবযোগে তার ইহকালের ফেসবুক
অ্যাকাউন্ট চালু রাখতে এখন পর্যন্ত পারছে না।
আরো কয়েকদিন আগে শরৎচন্দ্রের জন্মদিন এসেছিল। ফেসবুকে
জানিয়েছিলাম শ্রদ্ধা। তারও আগে ছিল বিভূতিভুষন-এর জন্মদিন। তাছাড়া সম্প্রতি এরকমক
আরো কয়েকটা বড় মানুষের জন্মদিন পার হয়ে গেল। ফেসবুকে তাদের জন্মদিন পালন করা হল। বস্তুবাদী
হিসেবে ভাবতে অবাক লাগে, যাকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি সে জানতে পারছে না জেনেও সেকাজ
করছি কেন? আমি একা করছি না, সবাই করছে, নাস্তিকরাও করছে। কেন?
এতক্ষণ আসল কথার ভুমিকা হল। এবার আসল কথায় আসি।
“শুভ জন্মদিন। জানি আর ফিরিবে না এই দিন তোমার জীবনে; মরনেও
ফিরিবে না কি?”
ফেসবুকে মৃতবন্ধুর জন্মদিনে এমন কথা লিখলে কি আমাকে ‘নকল
নাস্তিক’ বলা হবে? আর সেই ভয়ে আমি কি হাত গুটিয়ে বসে থাকব? তাতে নিজের মনের প্রতি
অবিচার করা হবে না কি?
বয়সের হিসেব থেকে তিন বছর বাদ দিলে বলা যায় অর্ধশতাব্দী পার
করে এসেছি। অনেক পরিচিতজনকে মাটির পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে দেখেছি। মৃত্যুসংবাদ আমাকে
আর শোকার্ত করে না, কিন্তু ভাবায়। খুব ছোট থাকতে প্রথম মৃত্যু দেখেছি
জ্যাঠামশায়ের। যাকে দেখতাম খড়ম পরে বিকট শব্দ তুলে হাঁটাহাঁটি করতে। সেইভাবেই
একদিন খড়ম পরে হাঁস তাড়াতে গিয়ে নিজেই পড়ে গেলেন, আর পা ভেঙে শয্যাশায়ী রইলেন বেশ
কিছুদিন। তারপর একদিন মারা গেলেন। দেখলাম চোখবুজে শুয়ে আছেন, যেন ঘুমোচ্ছেন। আমি
তখন খুব ছোট হলেও জানতাম এই ঘুম আর ভাঙবে না। মন আর জ্ঞান মেলাতে পারছিলাম না। দর্শন
কি জিনিস তখনো শুনি নি। সাহিত্যও জানতাম না। কিন্তু কল্পনা ছিল মনের আকাশ জুড়ে।
আরো বেশ পরে জেঠিমা’র মৃত্যু দেখলাম। আরো পরে বাবার মৃত্যু দেখলাম। প্রতিবারে একই
অভিজ্ঞতা, একই ভাবনা, একই কল্পনা। ততদিনে আমি হাইস্কুলে। বাসরাস্তা পার হয়ে
অনেকদুরে যেতে শিখলাম। আমাকে দারুন আকর্ষন করত খ্রীস্টানদের কবরখানা। অনেক গাছ
ছিল, পাখি ছিল। নির্জন দুপুরে একাই চলে যেতাম। ঘুরে ঘুরে দেখতাম। ইট আর পাথরের
তৈরি কবরের বেদীর উপর শাদা পাথরের উপর অস্পষ্ট লেখায় তবুও বোঝা যেত সাহেবদের
ইংরেজি নাম, জন্মদিন ও মৃত্যুদিন। পাশাপাশি কয়েকজনের তারিখ মিলিয়ে টাইমলাইন তৈরি
করতাম – এই সময় ইনি ছিলেন কিন্তু উনি ছিলেন না, এই সময় ইনি-উনি দু’জনেই ছিলেন, এই
সময় ইনি হলেন উনি, টাইমলাইন থেকে সরে গিয়ে, আর উনি হলেন ইনি, টাইমলাইনে এগিয়ে এসে,
তারপর এক সময় ইনি-উনি কেউ নেই কিন্তু পাশের আরেকজন টাইমলাইনে ঢুকে পড়ছেন জন্মতারিখ
নিয়ে। তার মৃত্যুতারিখ লিখে দিয়ে তার সন্তানেরা দমদম ছেড়ে চলে গেছে ইংল্যান্ডে,
তাদের কবর হবে ইংল্যান্ডে, আমি জানতে পারব না।
কিন্তু জ্যাঠার খড়ম-পায়ে হাঁটার শব্দ আমি এখনও শুনতে পাই।
জেঠিমার সক্রিয় হাঁটাচলা কথাবার্তা এখনো ছবির মত মনে আছে। ওরা এখন কোথায় আছে?
জানতে ইচ্ছে করে না কি? কিন্তু জানার যেহেতু কোন উপায় নেই, কল্পনাই আমার আশ্রয়।
সেই কল্পনাকে ভরাট করেছে ধর্মীয় উপাখ্যান, স্বর্গের বর্ননা, জাতকের গল্প, এবং
সাহিত্য। মাঝেমাঝেই স্বপ্ন দেখেছি বাবা ফিরে এসেছে আর আমরা বুঝতে পারছি না
ব্যাপারটা কি হল, কিভাবে হল। স্বপ্নটা জেগেও দেখেছি। পাগল? নাকি এটাই স্বাভাবিক?
No comments:
Post a Comment