Wednesday, 4 November 2015

দেবচৌধুরীর আত্মহত্যা একটি দার্শনিক অভিযান






আমার এই নায়কটির নাম নিয়ে অনেক চিন্তাভাবনা করে অবশেষে নিজের নামটিই তাকে দিলাম। তাই পাঠক তাকে দেব চৌধুরী-নামে চিনবে। ডাকনাম দেবু

এই যুবকটির কিছু অহংকার আছে এবং তার মতে, অহংকার হ’ল বেঁচে থাকার অবলম্বন-বিশেষ। তার নিজের অহংকার তার অস্তিত্ব সম্পর্কে, যা বেশ উজ্জ্বল। তার দ্বিতীয় অহংকার হ’ল কিঞ্চিৎ সততা আর এটা সে বিশেষ বিপদে না পড়া পর্যন্ত মেনে চলার চেষ্টা করে থাকে।

কিন্তু দু-দু’বার পরীক্ষায় ফেল করায় তার অহংকারে চিড় ধরল এবং তার নিজস্ব দর্শন অনুযায়ী সে বেঁচে থাকার অবলম্বন হারাল। এবং সে আত্মহত্যার কথা ভাবল যদিও সরঞ্জামের অভাবে সে-মুহুর্তে তা সম্ভব হ’ল না। বাড়ি ফেরার পথে নকল প্রেসকিপশনে সে কিছু ঘুমের ট্যাবলেট কিনল আর বাড়ি ফিরেই নিজের পড়ার ঘরে ঢুকে কবিতার খাতা খুলে বসল। জীবনের শেষ কবিতাটা সে লিখে ফেলবে।

কবিতার নামের জায়গায় সে লিখল “জীবিত পৃথিবীর উদ্দেশ্যে”। তারপর লিখল –

আত্মহন্তার কৈফিয়ৎ যে ওজুহাত
তা আমিও জানি।
তোমরা কি জানো –
তোমাদের বাঁচায় বাহাদুরি নেই, বীরত্বও?
তোমাদের এক সংস্কার –
জোকের মতন আকড়ে থাকো পৃথিবীকে...

এই পর্যন্ত লিখে দেবু একটা চারমিনার ধরাল এবং সামনের জানলাটা দিয়ে বাইরের আকাশের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর টেবিলে মাথা গুজে আত্মহত্যার কথা ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখল তার স্বপ্নের মানবী দু’হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসছে। দৃশ্যটা একটা শাদাকালো ফোটোগ্রাফ হয়ে ছোট হতে হতে দূরে আকাশের মধ্যে হারিয়ে গেল।

স্বপ্নটা তার আত্মহত্যার চিন্তাকে আরো জোরাল করল কিন্তু ইতিমধ্যে কিছুটা সময় পেয়ে তার বিবেচনাশক্তি ফিরতে শুরু করেছে। এই দেবুটা একবার কুকুরের কামড় খেয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিল কুকুরটাকে মেরেই ফেলবে যদিও সেই মুহুর্তে কুকুরটা পালিয়ে বেঁচেছিল। পরে ডাক্তারের নির্দেশে আর চোদ্দটা পাস্তুরের খোঁচা এড়াতে সে কুকুরটাকে আরো কিছুদিন বাঁচতে দিল। সেটা ছিল খুনের সমস্যা আর এবারেরটা আত্মহত্যার। দু’টোই কঠিন কাজ। কিন্তু দেব চৌধুরী লড়াই না করেই হেরে যাওয়ার পাত্র নয়।

তা’বলে বুদ্ধিবিবেচনাকেও সরিয়ে রাখা যায় না। গেজেটে নাম নেই দেখে আত্মহত্যা করে বসলে পরে মার্কশীট-এ যদি দেখা যায় পাশ করেছে, তখন আর ফেরত আসা যাবে না। তাই সে মার্কশীট হাতে পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করাই স্থির করল। এদিকে দশদিন অপেক্ষা করার পর কুকুরটাকে মারতে গিয়ে দেবু আবিষ্কার করেছিল খুন করতে গেলে যতটা রুদ্ররসের প্রয়োজন তার অনেকটাই সময়ের সাথে হ্রাস পেয়েছে ফরলে সে এখন খুন করতে অক্ষম। অগত্যা সে কুকুরটাকে অভিশাপ দিয়েছিল, তুই সারাজীবন কুকুর হয়েই বেঁচে থাকবি।

এদিকে মার্কশীট হাতে পাওয়ার আগে পর্যন্ত সে কিছুটা আশার আলো দেখার অভ্যাস করে ফেলেছিল। কাজেই হতাশাব্যাঞ্জক মার্কশীটটা তাকে দু’ভাবে হতাশ করল। প্রথমত প্রমাণ হ’ল যে গেজেটে কোন ছাপার ভুল ছিল না। তাছাড়া আত্মহত্যা না-করার পিছনে আর কোন যুক্তি খুঁজে না পেয়ে এবার সে ওজুহাত খুঁজতে শুরু করল। সমর্থন পাওয়ার জন্যে মনীষীদের স্মরণ করতে গিয়ে কালিদাসের নাম মনে পড়ল। এই দেবু একবার মোমবাতির আগুনে চায়ের জল ফুটিয়ে নিজেকে কালিদাস মনে করে গর্বিত হয়েছিল। কালিদাসই প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন যে মাটির কলসের ঘর্ষনে পাথর ক্ষয়ে যেতে পারে। কিন্তু এবার দেবু কালিদাসের অক্ষমতার একটা দিক আবিষ্কার করে বসল – প্রতিটা মানুষ আত্মহত্যার কথা ভাবে কিন্তু সফল হয় মাত্র কয়েকজন। স্বয়ং কালিদাস একাজে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু দেব চৌধুরী একাজে সফল হবেই। উপরন্তু সাঁতার না-জানায় সে একটা বাড়তি সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে। সুতরাং সে ঘাটের শেষ ধাপে নেমে দাঁড়াল।

এবং দাঁড়াতেই সে মৃত্যুর মুখোমুখি হ’ল। এতে করে সে ঘাবড়ে গেল। নার্ভাস-সিস্টেম গড়বড় হয়ে গেল গেল এবং সে কাঁপতে শুরু করল। এবং ব্যালান্স রাখতে না পেরে সে জলে পড়ে গেল।

জলে পড়ে গিয়ে আরেক বিড়ম্বনা। সাঁতার না-জানা হাত-পা’গুলো শিক্ষাদীক্ষার নামে গালাগালি দিয়ে দাপাদাপি শুরু করল। যদিও জলের টানে সে তলিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু হাত-পা ছোঁড়ার দ্রুতগতি তাকে একই জায়গায় ভাসিয়ে রাখল। এবন্নগ একসময় আবিষ্কার করল সে ডাঙায় উঠে বসেছে। সেখানে বসে ভিজে পোষাকেই সে ধ্যানস্থ হ’ল এবং ঘন্টাখানেক ধ্যানস্থ থেকে সে দু’খানি তত্ব আবিষ্কার করল – প্রথমত, আত্মহত্যা জিনিসটা তার দ্বারা কোনদিন হবে না। দ্বিতীয়ত, হ্যাপিনেস কথাটাই হাস্যকর এবং আনহ্যাপিনেস ব্যাপারটা বেশ মজার।

তারপর দেব চৌধুরী গাত্রোত্থান করল এবং চলতে চলতে এরপর কি করা যায় তাই ভাবতে ভাবতে এবং অন্তত কিছু একটা করার তাগিদায় সে এক কঠিন প্রতিজ্ঞা করে বসল – মৃত্যুর আগের মুহুর্ত পর্যন্ত সে বেঁচে থাকার মিশন জারি রাখবে।


No comments:

Post a Comment