Friday, 16 March 2018

“থিয়েটারকে নষ্ট করে দিচ্ছে দর্শকরাই”




 
________________
“থিয়েটারকে নষ্ট করে দিচ্ছে দর্শকরাই”বলেছেন নাসিরুদ্দিন শাহ।
অবাক হওয়ারই কথা, একজন নাট্যকার বলছেন দর্শকের বিরুদ্ধে।
এর আগে কি এমন দেখেছি? একজন দোকানদার তার খরিদ্দারের বিরুদ্ধে অপমানজনক কথা বলছেন? অথবা একজন সাহিত্যিক বলছেন পাঠকের বিরুদ্ধে,  অথবা একজন সঙ্গীতশিল্পী বলছেন শ্রোতার বিরুদ্ধে? বরং দেখেছি বাংলার সেই ক্লাসিকাল যুগ থেকে এখন পর্যন্ত, সাহিত্যিক তার পাঠককে, সঙ্গীতশিল্পী তার শ্রোতাকে, ফিল্মমেকার ও নাট্যকার তার দর্শককে,  তোল্লা দেয় যত পারে, যাতে করে তার বিক্রির বাজার ঠিক থাকে। সম্পর্কটা ওই দোকানদার-খরিদ্দারের মতই। এবং শাস্ত্রে বলে, খরিদ্দার নারায়ণ।  
অবশ্য ব্যতিক্রম হিসেবে মনে পড়ছে মান্না দে এবং ঋত্বিক ঘটক। ঋত্বিক তো আগাগোড়াই চাঁচাছোলা, সবাই জানে। একবার এক মঞ্চে উঠে বলেছিলেন – “আমি সিনেমা করি, ভালই করি। যারা দেখার তারা দেখবে, যারা না-দেখার তারা দেখবে না। তারা না দেখলে আমার বয়েই গেল”। বলেই কাচকলা দেখিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে গেলেন।
 আর, মান্না’র “সে আমার ছোট বোন” গানের শেষে একটা মৃদু আভাস রেখে গেছেন শ্রোতার বিরুদ্ধে 
নাসিরুদ্দিন কথাটা বললেন এমন সময়ে যখন আমি আদৌ থিয়েটার নিয়ে ভাবছিলাম না বরং ভাবছিলাম গণতন্ত্রের কথা, যে, গণতন্ত্রকে নষ্ট করে দিচ্ছে জনগণই, জনগণের দুর্নীতিই প্রতিফলিত হচ্ছে সরকারে। একদা রাজতন্ত্র ছেড়ে গনতন্ত্রে আসার পিছনে ভাবনাটা ছিল যে, শাসনব্যবস্থা কোন এক ব্যক্তির ইচ্ছায় নয়, সকল/সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের ইচ্ছায় চলবেএখন দেখা যাচ্ছে কোন রাজনৈতিক দল যদি দুর্নীতিমুক্ত হয়, সেখানে আর কেউ যেতে চাইছে না। শূন্যগোয়াল নিয়ে তো আর ব্যবসা চলে না, তার চেয়ে ভাল দুষ্টুগোয়াল। এবং তার পরেও সব নেতাই সোচ্চারে বলে থাকেন – জনগণ ভুল করে না। ব্রাকেটে, হেরে যাওয়ার পরে সিপিএম বলেছিল “ওরা (জনগণ) ভুল করল”।
বাস্তবিক, ধর্মের মত রাজনীতি এবং সংস্কৃতিও বিশেষ বাজারনীতি মেনে চলে, যার প্রধান দুটো ভিত্তি হল “ক্লায়েন্ট ক্লাস্টার” ও “ফিক্স মারকেট”। ব্র্যান্ডেড কোম্পানী বা ক্ষমতাসীন দলের যথারীতি একটা ফিক্স মার্কেট থাকেই, পাশাপাশি চলে রিসেটিং অফ ক্লায়েন্ট ক্লাস্টার।
ধর্মান্তরের প্রতিযোগিতা অথবা ধর্মান্তরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সে-ও ওই রিসেটিং অফ “ক্লায়েন্ট ক্লাস্টার”, যার পরিধির বাইরে রয়েছে নাস্তিকরা, তাই নাস্তিকদের ধরে ধরে আস্তিক বানানো সেই ধর্মবনিকদেরই “ক্লায়েন্ট ক্লাস্টার”-এর পরিসীমা বৃদ্ধির অপচেষ্টা – আগে তো বেটা ধার্মিক হোক, তারপর দেখা যাবে সে আমার ধর্মে আসে নাকি অন্য ধর্মে যায়। এক ফেরিওয়ালা বলেছিল, আমার কাছ থেকে না কিনলেও আরেকজনের কাছ থেকে তো কিনবেন, সে-ও তো আমারই ভাই। সত্যিই তাই, সব দোকানদার ভাই-ভাই, তাই তো দেখি হিন্দু-মুসলিম নিয়ে কোন্দলকারীরা উচ্চপর্যায়ে গিয়ে ভাই-ভাই হয়ে যায়। এই যে কংগ্রেস-সিপিএম-এর এত বিরোধ দেখতে দেখতে বড় হলাম, কাশিপুর-গণহত্যার সময়ে একটা স্কোরবোর্ড টাঙানো হয়েছিল যাতে পুলিশ, কংগ্রেস আর সিপিএম, কে ক’টা খুন করল তার স্কোর লেখা হচ্ছিল। যেন কে ক’টা গোল দিচ্ছে বা উইকেট ফেলতে পারছে। পরের ইনিংস-এ পুলিশ আর কংগ্রেস ছিল এক দলে, সিপিএম-কে রাখা হল মার খাওয়ার দলে। অর্থাৎ, রিসেটিং অফ ক্লাস্টার।  
যাক গে, কথা হচ্ছিল থিয়েটার নিয়ে অথচ অনেক কথা বলে ফেললাম রাজনীতি, ধর্ম আর অর্থনীতি নিয়ে। থিয়েটার যারা করে, সেরকম এক নাট্যকার আমাকে একদিন বলছিল, এখন যা অবস্থা শুরু হয়েছে, সরকার বলছে পলিটিকাল নাটক করা যাবে না, কিন্তু তাহলে তো নাটকই করা যাবে না। তো, আমি তাকে বলেছিলাম, পলিটিকাল নাটক কোরো না, শুধু ধর্ম আর অর্থনীতি নিয়ে এগোতে থাকো। তাতে, সে কিছুক্ষণ চিন্তা করে অবশেষে বলে উঠল, সেটা তো আরো ডেঞ্জারাস!  
কার্যত, পলিটিক্স বলে শুরুতে কিছু হয় না। কিছু মানুষের চাহিদা আর স্বার্থ যখন সুরে-সুরে মেলে না, তখনই বাধে সংঘাত। এবং শুরু হয় পলিটিক্স। কলেজের কোন একজন ছাত্রীর অবমাননা হলে সেটা অরাজনৈতিক। তার প্রতিকারের জন্য উপাচার্য’র কাছে গেলে সেটাও অরাজনৈতিক। উপাচার্য সেই দাবী উপেক্ষা করলে সেটাও অরাজনৈতিক। ছাত্ররা সংঘবদ্ধ হয়ে দাবী জানালে সেটা কিন্তু পলিটিক্স, আবার সেই শান্তিপূর্ন অবস্থানকারী ছাত্রদের উপর শেষরাতে লাইট নিভিয়ে পুলিশ দিয়ে মারধোর করলে সেটা কিন্তু অরাজনৈতিক। এবং সেই মারধরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মিছিল করলে রাজ্যপাল স্বয়ং ছাত্রদের কাছে আবেদন করে তারা যেন নির্যাতিত বন্ধুর জন্যে মিটিং-মিছিল অর্থাৎ রাজনীতি না করে নিজেদের পড়াশোনায় মনোযোগী হয় (অর্থাৎ, বন্ধু গোল্লায় যাক, নিজের স্বার্থ দেখ)তাহলে কী দাঁড়াল? আমরা ভদ্র-শিক্ষিত জনগণ রাজনীতি কাকে বলব? এর উত্তরটা ওই “টেররিজম কাকে বলব” প্রশ্নের মত, এবং সহজ উত্তর হল, কতৃপক্ষ বা শাসক বা সরকার যাকে টেররিজম বা পলিটিক্স বলছে আমরাও তাকেই তাই বলব। এবং তারপরে বলব, সত্যমেব জয়তে।  
যাক গে, রাজনীতি নিয়ে আমি বিশেষ কিছু বলতে চাই না, আমার এই বর্তমান রচনার বিষয় থিয়েটার ও দর্শক। যাই করি না কেন, রাজনীতিকে যদি বাদও দেই, অর্থনীতিকে বাদ দেওয়া যাচ্ছে না একেবারেই। এমন কি অর্থনীতি থেকে যদি টাকার প্রসংগটাও বাদ দেই (টাকা ছাড়া নাটক একেবারে অসম্ভব, তা নয়।), তবুও থেকে যাচ্ছে বিজনেসের দুটো অবিচ্ছেদ্য প্রসঙ্গ – শ্রম আর সময়। নাট্যদলের কর্মীরা দিচ্ছে শ্রম+সময়, এবং দর্শক দিচ্ছে সময়। এর সঙ্গে টাকার প্রসঙ্গটা যুক্ত করলে দেখা যাচ্ছে - নাট্যদলের কর্মীরা দিচ্ছে শ্রম+সময়+টাকা, এবং দর্শক দিচ্ছে সময়+টাকা। এবং অবশ্যই দু’পক্ষই কিন্তু তারা কি দিল আর তার বিনিময়ে কি পেল, তার হিসেব বুঝে নেবে। এই চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে টাকার প্রসঙ্গটা জোনাকির মত, কখনো আছে, আবার কখনো নেই। লেখার দৈর্ঘ কমাতে তাই টাকার প্রসঙ্গটা বাদ দিয়েই এগুনো যাক।
এবার এসে যাচ্ছে দুটো অনিবার্য প্রশ্ন –
নাট্যদল বা নাট্যকার বা নাট্যকর্মী, তারা কী চায়?
(ক) কমিটেড বা দায়বদ্ধ নাট্যকর্মী কী চায়? 
(খ) উপার্জনলোভী নাট্যকর্মী কী চায়? 
দর্শক কী চায়?     
(ক) দায়বদ্ধ দর্শক কী চায়?
(খ) তামাশা-প্রিয় দর্শক কী চায়?

আমার মনে হয় এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমার বলে দেওয়ার অপেক্ষায় নেই। আমার এই প্রতিবেদন যারা ধৈর্য ধরে পড়লেন তাদের কাছে নিশ্চয় এইসব প্রশ্নের উত্তর মজুদ আছে। আমি শুধু আমার উপসংহারে আমার ব্যক্তিগত মতামতটুকু জানিয়ে রাখতে চাই, যে, ১এর ক যেমন সংখ্যালঘু ২এর ক’ও তেমনি সংখ্যালঘু, তবে খুব লঘু নয়, তা নাহলে ভাল নাটক কবেই উধাও হয়ে যেত। এবং বাস্তবে ২এর ক আছে বলেই ১এর ক আছে, অর্থাৎ, দায়বদ্ধ দর্শকই দায়বদ্ধ নাট্যকর্মীকে বাঁচিয়ে রাখে, নাসিরুদ্দিন যা বলেছেন।  

_________________________________________


No comments:

Post a Comment